আদিবাসী সাহসী মুক্তিযোদ্ধা খগেন্দ্রলাল চাকমা
আদিবাসী সাহসী মুক্তিযোদ্ধা খগেন্দ্রলাল চাকমা
তন্দ্রা চাকমা
মানবাধিকার ও উন্নয়ন কর্মী
দীর্ঘদিন ধরে উনাকে নিয়ে লিখব লিখব করে সময় করতে পারছিলাম না। তথ্য উপাত্ত যাছিল তা যথেস্ট নয় । আমি আবার ভীষণ খুতখুতে স্বভাবের তাই তথ্য যোগাড় করার জন্য আমি আমার বড় বোনকে ফোন দিলাম সে তার দেবর রতন চাকমার ফোন নাম্বার দিল । এখানে উল্লেখ্য উনি আমার বড় বোনের শ্বশুর। ফোন নাম্বার পাওয়া সত্ত্বেও প্রায় এক সপ্তাহ লাগলো উনাকে ফোন করতে । বিজয় দিবস পার হয়ে প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল কেবল আজ ফোন করে তথ্য নিতে পারলাম । তাহলে রতন চাকমার মুখ থেকে শোন যাক উনার কথা।
১৯৭১ সালে উনি ছিলেন মুরাদনগর থানার সার্কেল ইনস্পেক্টর। শুধু তাই নয় তিনি মুরাদনগর, হোমনা, বাঞ্ছারামপুর ও দেবীদ্বার এই ৪ থানার ও দায়িত্ব প্রাপ্ত ছিলেন । সে সময় রতন ছচাকমা মাত্র এক ১৩ কি ১৪ বছরের এক কিশোর,তখন উনি মানে রতন চাকমা ক্যাডেট কলেজের ভাইভা যাতে ভাল করতে পারেন সেজন্য ওখানে বাবার তত্তাবধানে এক গৃহ শিক্ষকের কাছে পড়ছিলেন । এর মধ্যে একদিন উনি মানে রতন দাদা বুঝতে পারলেন উনার বাবার কাছে থানার লোকজন ছাড়া আর ও কিছু লোকজনের আনাগোনা আবিস্কার করলেন। উনারা বিভিন্ন নক্সা নিয়ে প্রতি রাতে মিটিং করতেন।
যেহেতু কিশোর বয়স তাই কৌতূহল ও বেশী একরাতে রতন দা উনার বাবার রুম এ আড়ি পাতলেন, সেদিন জানতে পারলেন ইলিয়ট গঞ্জ ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার প্ল্যান হচ্ছে। কোন দিকে যাবে কার পজিসন কোথায় হবে, কোথায় ডিনা মাইট বসানো হবে এই বিষয়ে প্ল্যান হচ্ছিল। ঠিক তার পরদিনই ঢাকা চট্টগ্রাম রোডের ইলিয়ট গঞ্জ ব্রীজ উড়িয়ে দেয়া হয় । সময়টা ছিiল এপ্রিল এর শেষ সপ্তাহ অথবা মে মাসের প্রথম দিকে । আমি রতন দাদা কে তারিখটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনার ঠিক মনে নেই কবে। এই অপারেশন এর নেতৃত্ব দেন মুরাদনগর এলাকার মুক্তি বাহিনির কমান্ডার এবং বীর মুক্তি যোদ্ধা খগেন্দ্রলাল চাকমা । রতন দাদা আমাকে মুক্তি যোদ্ধা কাম্প কমান্ডার এর নাম জানতেন না । এই ঘটনার দুই দিন পর মুক্তি বাহিনির এই দলটি মুরাদনগর ছেড়ে আরও অন্যদিকে অপারেশন করতে চলে যায় । ইতিমধ্যে ঐ এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বিষয়টি জানতে পারেন । তারা পাকিস্তানী সেনা বাহিনিকে বিষয়টি অবহিত করেন । এখানে উল্লেখ্য যে তদানীন্তন কুমিল্লা জেলার ডি, এস, পি পাক আর্মি কে সহযোগিতা করেন।
ইলিয়ট গঞ্জ ব্রিজ উড়ানোর কয়েকদিন পর পাক আর্মি একদিন হঠাত করে পুরো মুরাদনগর ঘিরে ফেলে। দিনটা ছিল ৫ই মে ১৯৭১ । ওইদিন থানায় যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের সবাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় । পাক আর্মি কিশোর রতন দাদা কে ও ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে সবাইকে কুমিল্লা টাউনে নিয়ে যাওয়ার পর রতন দাদা কে একজন বিহারি আর ও এর হাতে দেওয়া হয়। যেহেতু বন্দি দের দুই টিমে ভাগ করা হয় । একদিন রতন দাদা আবিস্কার করলেন উনার বাবা ও অন্য টিমের আর কেও নেই। সেই সময় এর অনুভূতি বলতে গিয়ে রতন দা যা বলেছিলেন প্রথমে নাকি তাকে মেরে ফে লার কথা। কিন্তু বিহারী আর ও এর দয়া হওয়াতে তিনি বেচে ছিলেন । তিনি মানে রতন দাদা কুমিল্লার পুলিশ ক্লাব এ প্রায় ৩ মাস ছিলেন । পরে উনাকে একজন চাটগা বাড়ি এমন এস আই এর সহযোগিতায় চিটাগাং পাঠিয়ে দেওয়া হয় । উনি উনাদের চক বাজারের বাসায় গিয়ে দেখেন বাসায় কেউ নেই সব মালামাল লুট হইয়ে গেছে। পরে আবার উনি রাঙ্গামাটি ফিরে আসেন। এসে উনার মায়ের এক কাজিন এর বাসায় উঠেন । পরে মা ও আর সবার সাথে দেখা হয় ।
রতন দাদার কাছ থেকে যা জানতে পেরেছি তা হল খগেন্দ্রলাল চাকমা কে কুমিল্লা ক্যান্টন মেন্ট এ ধরে নিয়ে আর ৩ জন হিন্দু এস আই সহ উনাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু আর যারা মুসলমান ছিলেন তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কুমিল্লা পুলিশ লাইনে এখন ও শহীদ দের স্মরণে যে স্মৃতি সৌধটি আছে সেখানে ৩ নাম্বার তালিকায় উনার নাম আছে । স্বাধীনতার প্রায় ৬ বছর পর খগেন্দ্র লাল চাকমার পরিবারের সাথে আমার দেখা হইয়েছিল । তখন ও দেখেছি পিসি মানে উনার স্ত্রী বিশ্বাস করতেন উনি ফিরে আসবেন । পরে ১৯৮০ সালের দিকে কেবল পিসি বুঝলেন উনি কখনও ফিরবেন না । এখানে বলা ভাল উনার বড় ছেলে ডাক্তার কিশলয় চাকমার সাথে আমার বড় বনের বিয়ে হইয় ১৯৭৭। উনার পরিবার এখনও মুক্তি যোদ্ধা তালিকায় অন্তরভুক্ত হন নি তাই সেজন্য কোন সরকারী সুবিধা ও পাননি । এই দেশের জন্য বিশষ করে কুমিল্লা অঞ্চল কে শত্রু মুক্ত করার জন্য যার এত সাহসী অবদান তার পরিবার কেন স্বীকৃতি পাবেনা। মাত্র তত্তাবধয়ক সরকার এর আমলে প্রথম তার নামে স্মৃতি স্তম্ভ হয় রাঙ্গামাটি শহরে ঢোকার মুখে ।
আমার এই লেখা লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে যাদের কেউ মনে রাখেনা তাদের কথা লেখা । এখনকার কিছু লেখকের লেখা পড়লে মনে হয় যুদ্ধ কেবল উনারা একা করেছেন আর কেউ করেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ দের অবদান আছে সে কথা সবাই ভুলে গেছে। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে এই দেশ কখনও সত্যিকার গনতান্ত্রিক দেশে পরিণত হবে না ।

Comments