আমার যত স্কুল ও শিক্ষক
আমি আমার জীবনে অনেক
স্কুলে পড়েছি । তার কারণ হচ্ছে আমার বাবার বদলীর চাকরী ।এই স্কুল
বদলের কারনে জীবনে অনেক ভাল ভাল শিক্ষক পেয়েছি, যাদের শিক্ষা আমার জীবন গঠনে অনেক
সাহায্য করেছে । উনাদের সবার কথা ও আমার স্কুল গুলোর কথা বলার আগে, আমাদের সব
ভাইবোনদের গৃহ শিক্ষকের কথা না বললে নয় । উনার নাম যোগেন্দ্র, তবে উনার নামের
পিছনে কি টাইটেল সেটা মনে নেই এখন। আমরা উনাকে পিতার মত সম্মান করতাম । আমার ও
আমার ছোট বোনের হাতে খড়ি মা এবং উনার হাতে । উনি ছিলেন অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের
একজন অবসরপ্রাপ্ত ডিটেকটিভ পুলিশ ইন্সপেক্টর। একবার ডাকাত ধরতে গিয়ে উনার ডান
হাতের তিনটি আঙ্গুলই কেটে গেছিল। কাটা আঙ্গুল জোড়া হাতে উনি যে হাতের লেখা লিখতেন
তা ছিল ছবির মত । আমাদের উনি পাতাভরতি হাতের লেখা দিতেন ।আমরা উনার লেখা অনুসরণ
করে হাতের লেখা লিখতাম । প্রতি পুজার সময় উনার বাসায় নিমন্ত্রণ থাকত ।উনি নিজে এসে
আমদের নিয়ে যেতেন ।আমরা মনের আনন্দে উনাদের বাড়ির পূজায় অংশ নিতাম । উনি শুধু
আমাদের পড়াতেন না আমাদের সাথে গল্পও করতেন । উনি উনার চাকরি জীবনের অনেক মজার
অভিজ্ঞতায় বলতেন যা আমাদের কাছে ছিল অভাবনীয় ।
উনি আমার নাম ধরে ডাকতেন না, উনি আমার নাম দিয়েছিলেন জগধাত্রী । উনার কাছে
আমরা ছিলাম মহাপুরানের দেবদেবী । উনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন আমাদের জীবনে সে সব
দেব দেবীর প্রভাব থাকবে মানে, আমাদের কাজে সেই দেবী বা দেবের প্রভাব থাকবে, তিনি
যাকে যে নামে ডাকবেন । যেমন, তিনি আমাকে জগধাত্রী নামে ডাকতেন, আর তিনি বিশ্বাস
করতেন আমি একদিন জগতের সেবা করব। জগত বলতে তিনি বলতে চেয়েছেন আমার চারপাশের
মানুষকে সেবা করব । উনি আমার ভিতর কি দেখে এটি বলেছিলেন আমি জানিনা । তবে উনার কথা
কিন্তু মিথ্যা হয়নি তা এই মধ্যবয়সে এসে উপলদ্ধি করতে পারছি । আমি কখন যে এই
স্পিরিট নিয়ে বড় হয়েছি আমি নিজেও জানিনা ।
উইকিপিডিয়ার মতে, “ জগদ্ধাত্রী বা জগদ্ধাত্রী
দুর্গা হিন্দু শক্তি দেবী। ইনি দেবী দুর্গার অপর রূপ। উপনিষদে এঁর নাম উমা হৈমবতী। বিভিন্ন তন্ত্র ও পুরাণ গ্রন্থেও এঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও জগদ্ধাত্রীআরাধনাবিশেষত বঙ্গদেশেই প্রচলিত।[১] আবার পশ্চিমবঙ্গের হুগলিজেলার চন্দননগর ও নদিয়া
জেলারকৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী উৎসব জগদ্বিখ্যাত। কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু
বাঙালির ধর্মীয় মানসে রাজসিক দেবী দুর্গা ও তামসিক কালীর পরেই স্থান সত্ত্বগুণের দেবী জগদ্ধাত্রীর।জগদ্ধাত্রী দেবী ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা ও সিংহবাহিনী। তাঁর হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ; গলায় নাগযজ্ঞোপবীত। বাহন সিংহ করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ হস্তীরূপী অসুরের পৃষ্ঠে
দণ্ডায়মান। দেবীর গাত্রবর্ণ উদিয়মান সূর্যের ন্যায়। ”
আমি মাঝে মাঝে আমার বাবার কথা ভেবে অবাক হই বাবা কি করে এমন ভাল একজন মানুষ কে
আমাদের গৃহ শিক্ষক করেছিলেন যিনি আসলে মহাভারতের গুরু সমতুল্য । যার শিক্ষার
প্রভাব এখনও আমার জীবনের পরতে পরতে বিদ্যমান । উনি বাংলা, ইতিহাস, ভূগোল, ইংরেজি
অংকে দক্ষ ছিলেন । উনি শুধু বইতে শিক্ষাকে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের দেশপ্রেম কে
জাগাতে পারে এমন গল্প শোনাতেন । উনি আমাকে বলতেন বড় ক্লাশে উঠলে, মানে পুরা
যুক্তবর্ণ শিখতে পারলে ডিটেকটিভ বই পড়তে তাহলে সাইন্স বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হবে।
এছাড়া তিনি বলেছিলেন অবসরে পেপার আর বই পড়তে তাহলে আমাদের অউটলুক বাড়বে । বিশ্বজগত
কে জানার জন্য ভ্রমনের পাশাপাশি বই পড়াও যে একটা গুরুত্ববহ বাপ্যার উনি সেটা ভাল
বুঝতেন । আমাদের শিক্ষার ভিত হিসাবে উনি সেটা অন্তরে ধারণ করে দিয়ে গিয়েছিলেন । আজ
এই মধ্যজীবনে এসে আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। আমার ভাবতে ভাল লাগছে তার চিন্তার বীজ আমি আমার সন্তান মানে আমার মেয়ের মধ্যে রোপণ করতে
পেরেছি । কি করেছি না করেছি সময় সেটা বলে দেবে। আমার এই লেখার পাঠকদের বলব আপনারা
আমার বাবার মত একজন শিক্ষা গুরু খুজে বের করুন যিনি আপনার সন্তানকে একজন প্রকৃত
সু-মানুষ কে বের করে আনবে । যে কোন পরিস্থিতে যে নিজের লক্ষ্য সমুন্নত রাখবে এবং
নিজ লক্ষ্যে পৌঁছাবে ।
এতো গেল আমার গৃহশিক্ষকের
কথা, এছাড়া আমি প্রথম যে স্কুলে পড়েছিলাম সেটা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ।
আমাদের পরিবার যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল । সে সময় আমরা কিছু
সময়ের জন্য আগরতলা ও পরে জম্পুই হিলের দেশ কাঞ্চনপুরে চলে যাই। আমরা ওখানে কিছুদিন
মানে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত পড়েছি ।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাবার
তখনকার বৃহত্তর নোয়াখালী জেলায় পোস্টিং হয় পুলিশ সুপার হিসাবে । সেখানে আমরা এক
স্কুলে তিন মাসের মত পড়েছিলাম । আমরা এরপর হবিগঞ্জে চলে আসি এখানে বিকেজেসি গার্লস
হাই স্কুলে পড়ি। এখনে ক্লাস ফাইভে উঠার পরপরই আমরা আমারা আওয়ার লেডি ফাতিমা গার্লস
হাই স্কুলে ভর্তি হই । এখানে ক্লাস সেভেনে উঠার কয়েক মাসের মাথায় আমরা বাবার আর্লি
রিটায়ারমেন্টের কারণে রাঙ্গামাটি চলে আসি । এখানে এসে বাবা আমাদের বাসার কাছে শাহ
হাই স্কুলে ভর্তি হতে বলেন । আমরা এখানে ভর্তি হই । এখানেই আমার স্কুল জীবনের
পরিসমাপ্তি ঘটে মানে আমার এস এস সি শেষ হয় ।
এই যে এত স্কুলে পড়েছি তার যে
ফল সেটা হল আমার নেই নেই করে অনেক বন্ধু বান্ধবী আছে যারা আমার জীবনকে ভরিয়ে
দিয়েছে । সবাই নিজেদের গুণে বিভিন্ন কাজ করে । হাত বাড়ালেই বন্ধুদের সহযোগিতা পাই
। বর্তমান যুগে ক্যারিয়ার গড়তে হলে নেটওয়ার্কিং জরুরি । এটা আয়ত্ত করতে আমার
সুবিধা হয়েছিল এই এত স্কুলে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে ।
এই এত স্কুল এত শিক্ষা এর সবই
আমার কাজে লেগেছে যে কোন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে চলার শিক্ষার মাধ্যমে । এই সবের
মুল্য আমার জীবনে অনেক বেশী । এই এত বছরে আমি আমার নিজের পরিচালক হতে পেরেছি এর
সবই আমার বিভিন্ন স্কুলে পড়ার অভিজ্ঞতা ।তাই বোধ হয় আমার কাছে জীবন এত বৈচিত্র্যময়
।

Comments